মাতৃভূমির অনুভূতি

আপনি কি জানেন মাতৃভূমি মানে কী অথবা মাতৃভূমির অনুভূতি কেমন? যদি আমি এককথায় বলি তবে, যেই ভূমিতে মানুষ তার মায়ের কোলে আসে সেই ভূমিই হলো তার মাতৃভূমি৷ এবার মাতৃভূমির অনুভূতি নিয়ে কথা৷ আমাদের মধ্যে খুব কমই এমন মানুষ আছে যারা নিজেদের মাতৃভূমির ব্যপারে তাদের অনুভূতি প্ররাশ করে৷ অথবা এমনটা বলা যায় যে, তারা নিজেদের মাতৃভূমির জন্য কোন কিছু অনুভব করে৷ অধিকাংশ মানুষের মুখ তো নিজের দেশের চেয়ে অন্য দেশের প্রসংশায় পঞ্চমুখ৷

কেন, আমাদের দেশেকি এমন কিছুই নেই যা নিয়ে গর্ব করা যায়, অনুভূতি প্রকাশ করা যায়! একথা শুনলে কেউ কেউ বলবে আছে তো, তবে গুটি কয়েক মাত্র৷ আমি বলব আপনি নিজেই নিজেকে আজও চিনতে পারেননি৷ আর তার সাথে নিজের দেশকেও৷ গুনীজনরা বলেন, যখন কাউকে ভালোবাসা হয় তখন তার খুঁতগুলো গুন মনে হয়ে দাঁড়ায়৷ আরে ভাই আগে তো নিজের দেশকে ভালোবাসো তবেই তো তোমার চোখে দেশের সকল গুনগুলো প্রকাশ পাবে৷ কি নেই আমাদের দেশে!

অর্ধশত বছরে আমাদের দেশ আজ পৌঁছে গেছে উন্নয়নের দ্বারপ্রান্তে৷ এতো বড় পৃথিবী, তার মধ্যে ছোট্ট একটুকরো ভূমি সেটা আমার জন্মভূমি৷ তবে আমাদের চিন্তা-ভাবনার কোন উন্নয়ন হয়নি৷ আমরা এখনও ভিনদেশ নিয়ে আলোচনার সময় চিন্তা করি, আমার দেশ আর এমন কি, যাকে নিয়ে ভাবা যায়৷ আরে ভাই, আমার দেশকে নিয়ে যদি আমি নিজেই গর্বিত না হই তবে কোন ভিনদেশীর এতো দায় যে, আমার দেশের প্রসংশা করবে! আচ্ছা আপনাদের মনে আছে আমাদের দেশে যুদ্ধের সূচনা হয়েছিল কিসের জন্য? উত্তর হলো, ভাষার ভিত্তিতে৷ আমাদেরকে আমাদের ভাষায় কথা বলতে দিতে হবে৷আর তা হলো আমার মায়ের ভাষা, আমার মাতৃভাষা, আমার বাংলা ভাষা ৷

কিন্তু দুঃখ জনক হলেও সত্য,আমার দেশের অধিকাংশ মানুষই ঘরের বাইরে এই বাংলা ভাষায় কথা বলতে লজ্জাবোধ করে ৷ কোনো শিক্ষিত ব্যক্তি যদি ইংরেজীতে কথা না বলে বাংলাতে কথা বলে তবে তাকে অগ্রহণ যোগ্য মৱে করা হয় ৷ আধুনিক হওয়ার জন্য কি ইংরেজী বলাটা আবশ্যক? কেন আমার বাংলা ভাষা কি বাঙালীদের আধুনিক হওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়? কেন নিজের ভাষাকে এমন মনে করা হয়, যে এটা শুধু ঘরের ভিতরেই রাখার জন্য ৷ বাইরে বের হলো তো মান,সম্মান ধুলিসাৎ হলো ৷ যেন নিজের আভিজাত্য কমে গেল ৷ আরেক ধরনের মানুষ আছে যারা মনে করে, আমি আর ইংরেজী তেমন ভালো পারিনা, তাহলে আমি বাইরের মানুষের সাথে কথা বলবো কি করে? সবাই আমাকে নিয়ে কি ভাববে? কি, এমনই তো হয়? কেন এদেশের ভাষা কি বাংলা নয়, তবে বাংলাতে যদি ঘরে কথা বলা যায়, বাইরে বলতে এতো সংকোচ বোধ হয় কেন? আমরা তো বাংলাদেশী ৷

তবে আমাদের পূর্ব পুরুষদের মধ্যে তো আর সবাই বাংলাদেশী ছিল না ৷ অর্থাৎ তখন বাংলাদেশের জন্মই হয়নি ৷ বাংলাদেশ, পাকিস্তান সহ আশে পাশের কয়েকটি দেশ ভারতের অংশ ছিল ৷ তখনকার সময় ইংরেজ বনিকরা বানিজ্যের জন্য ভারত উপমহাদেশে এসে ভিড় জমাতো ৷ একটা সময় ইংরেজরা নিজেদেরকে এই উপমহাদেশের শাসক বলে ভাবতে শুরু করে ৷ দেশবাসীর স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিয়েছিল, চারদিকে জুলুম নির্যাতনের রাজত্ব কায়েম করে ছিল৷ এক কথায় ভবিষ্যতের জন্য পুরো পঙ্গু করে দিয়েছিল ৷

গোলামীর জিঞ্জীর পরিয়ে রেখেছিল পুরো উপমহাদেশের গলায় ৷ যা আজও ইতিহাসের কালো অধ্যায় হয়ে আছে ৷ কিন্তু বড় আশ্চর্যের কথা হলো, আজ সবার কাছে সেই ইংরেজদের আভিজাত্য,আধুনিকতা, জীবন পরিক্রমা, খাবার,এমন কি ভাষা পর্যন্তও অনেক পছন্দনীয় ৷ তাদের সকল কিছু নিয়ে খুব গর্বও করা হয় ৷ একজন মানুষের নিজের দেশে যদি দু তিনটা বাড়িও থাকে তবে সে সেটাকে তেমন কিছুই মনে করে না ৷ কিন্তু যদি আমেরিকা বা লন্ডনে একটা টিনের বাড়ি থাকলেই সেটা নিয়ে বুক ফুলিয়ে গর্ব করে বলে , আমার অমুক দেশে বাড়ি আছে ৷

কেন নিজের দেশ নিয়ে সেই রকম অনুভূতি প্রকাশ করে না? যেই রকম অনুভূতি ভিনদেশ নিয়ে প্রকাশ করে! দেখুন না, মাত্র কয়েক বছর হলো মানুষ পিৎজা, পাস্তা, স্টেক এসব খাবার সর্ম্পকে জেনেছে ৷ সেগুলো নিয়ে মেতে উঠেছে ৷ সাধারনত কোনো ধনী পরিবারের ছেলে,মেয়েদের পছন্দের খাবার সর্ম্পকে জানতে চাইলে হয়তো আপনি বাঙালী খাবারের চেয়ে ভিনদেশী খাবারের নাম শুনতে পাবেন ৷ শুনতে কটু কথা হলেও বাস্তবতা এর চেয়ে ভিন্ন কিছু নয় ৷

আফ্সোস, যে দেশের মাটিতে আপনি সারাদিন সুখ দুঃখ নিয়ে ঘুরে বেড়ান, যে দেশের আকাশের চাঁদের আলো আর শীতল হাওয়া আপনার চোখে শান্তির ঘুম এনে দেয়, যে দেশের মাটিপানি আপানার মুখের খাবার জোগায়, যে দেশের বাতাসে আপনি বুক ভরে শ্বাসপ্রশ্বাস নেন, সে দেশে নিয়ে কি আপনি গর্ববোধ করতে পারেন না? যে ভাষায় আপনি আপনার জন্মের পর থেকে কথা বলছেন, যে ভাষায় আপনি আপনার রাগ,ভালোবাসার অনুভূতি প্রকাশ করেন, সে ভাষা কি যথেষ্ট নয় আপনার শিক্ষাগত যোগ্যতা আর আভিজাত্য প্রকাশের জন্য? সরকার আজ দূর্নিতী দমনের জন্য কত প্রয়াস করছেন ৷ যদি আমাদের সত্যিকারর্থে নিজ দেশের প্রতি ভালোবাসা থাকতো তবে কখনই কেউ কোনো দূর্নিতী করতো না ৷

কারণ মা আমাদের, মাতৃভূমিও আমাদের ৷ মাতৃভূমির সম্পদ আমাদের সম্পদ ৷ আর মাতৃভূমি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও আমাদেরই ৷ মাতৃভূমির সম্পদ শেষ তো আমরা ফকির, আর মাতৃভূমি সমৃদ্ধ তো আমরা ধনী ৷ এতো কিছুর পর, এখন অনেকেই বলতে পারে, “ইংরেজী ভাষার গুরুত্ব অপরিসীম ৷ আর ভিনদেশী আদব কায়দা তো একটু লাগবেই ৷ এার এমন কি সমস্যা”! আসলে ভিনদেশী আদব কায়দা মানাটা কোনো দোষের বিষয় নয়৷ আর ইংরেজী শিখাটা বা কাজের জন্য ইংরেজীর ব্যবহার করাটাও কোনো অন্যায় নয় ৷

তবে নিজের ঐতিহ্যকে সরিয়ে রেখে ভিনদেশী ভাষা ও সংস্কৃতি গায়ে জড়িয়ে নেয়াটা নিশ্চয়ই লজ্জা জনক ৷ তেতো কথা হজম করা কঠিন হলেও এটাই সত্যি যে, কাক যতই ময়ূরের পালক গায়ে জড়িয়ে ময়ূরের মত হাটুক না কেন, শেস পর্যন্ত কিন্তু সে কাক ই রয়ে যায় ৷ তো বাঙালী যতই ভিনদেশী চাদর গায়ে জড়িয়ে রাখুক, শেষ পর্যন্ত সে বাঙালীই ৷ এই অনুভূতি শুধু বাঙালীদের জন্যই নয় ৷ প্রত্যেক দেশের নাগরিকেরই তার নিজ দেশের প্রতি আবেগ প্রবণ ও শ্রদ্ধাশীল থাকা উচিত ৷

[ss_social_follow]

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।