দাম্পত্য জীবনের কলহ

স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কলহঃ প্রতিকী ছবি৷ সূত্রঃ গুগল

সংসার তখনই সুখের হয় যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক ভালো হয়। কারণ মনে রাখতে হবে স্বামী- স্ত্রী একে অন্যের বিপরীত কেউ নয়। দুজনেই এক ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্ত্রী হেরে গেল এর মানে হলো স্বামীও হেরে গেল। আবার স্বামী হেরে গেল এর মানে হলো স্ত্রীও হেরে গেল। 

গুণীজনরা বলেন, মানুষের জীবন তখনোই পূর্ণতা পায়, যখন মানুষ বৈবাহিক জীবনে আবদ্ধ হয়। কারণ বিবাহ মানেই তো দুজন অচেনা মানুষের মধ্যে বন্ধুত্ব তৈরি হওয়া। ভালো বোঝাপড়া তৈরি হওয়া। একে অন্যকে মন থেকে গভীর ভাবে ভালোবাসা। একের প্রতি অন্যের বিশ্বাস থাকা এবং সুখে-দুখে একে অন্যকে আগলে রাখা।

এই কথাগুলো কাগজ-কলমে লেখা বা মুখে বলা যতটা সহজ, বাস্তব জীবনে এর প্রতিফলন দেখতে পাওয়া ততটাই দুর্লভ। দাম্পত্য জীবনে কলহ প্রথমে শুরু হয় অবিশ্বাস থেকে। যখন স্বামী-স্ত্রী একে অন্যকে সন্দেহের চোখে দেখে অথবা অবিশ্বাস করে, তখন তাদের মধ্যে থাকা বোঝাপড়া বা ভালোবাসাটা ঠুনকো হয়ে পড়ে। ঠিক শুকনো লাউয়ের মত| মনে হয় ভিতরে যেন অনেক কিছুই আছে কিন্তু তবুও ফাঁপা।

আসলে সন্দেহ পোকাটা ঠিক ঘুণপোকার মতই। ঘুণপোকা যেমন কাঠ কে ভেতর থেকে খেয়ে ফেলে, ঠিক তেমনি সন্দেহ নামক পোকাটাও একটি সুন্দর সম্পর্ককে ভিতর থেকে নষ্ট করে ফেলে। তাই প্রত্যেক দম্পতিরই উচিত যা কিছুই হোক না কেন একজনের অন্যজনের প্রতি আস্থা না হারানো। যে যা কিছুই বলুক না কেন, কোন কিছু শুনে বাছবিচার না করেই সন্দেহ করা যাবে না।

স্বামী-স্ত্রীর ব্যবহার অবশ্যই বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত৷ কারণ তারা যদি একজন অন্যজনের জন্য বন্ধু হতে না পারে, তখন দুজনের মাঝে তৃতীয় একজন বন্ধুত্বের মুখোশ পড়ে উড়ে এসে জুড়ে বসবে। অথবা দুজনের কেউ না কেউ নিজের পছন্দ মত বন্ধু খুঁজে  নিবে। আর এখান থেকেই শুরু হয় সংসারে অশান্তি।কথায় বলে, কাউকে অন্ধের মত ভালবেস না। কারণ যাকে তুমি সবচেয়ে বেশি ভালবাসবে সেই কোনো না কোনো এক সময়ে তোমার চোখের পানি ঝরাবে।

এই কথাটা কারো কারো বেলায় সত্যিও হয়ে যায়। কারণ বাস্তব দুনিয়ার রং হাজার ধরনের হয়। তাই বিবাহের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে মোটেই হঠকারিতা করা উচিত নয়। ধীরে-সুস্থে, ভেবে-চিন্তে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। কারণ বিবাহ এমন এক লটারি যার মধ্যে হার-জিত এক বারই নির্ধারণ হয়। তাই সাবধানে পা ফেলা উচিত।

আল্লাহ তাআলা স্বামীর জন্য স্ত্রীকে অর্ধাঙ্গিনী বানিয়েছেন। তাই একজন স্ত্রীর জন্য উচিত হল সুখে- দুঃখে সর্বদাই স্বামীর পাশে থাকা। জীবনে চলার পথে তো চড়াই-উৎরাই আসবে। তাই বলে তো আর দুজনের পথ দু দিকে মোড় নিতে পারে না।

একজন স্বামী সারাদিন অক্লান্ত পরিশ্রম করে ঘরে ফিরে। ঘরে এসে যদি সে তার মানসিক প্রশান্তি নাই পেল, তবে তার ঘরে আসাটাই বা কেন? প্রতিটি স্ত্রীরই উচিত, তার স্বামীর জন্য প্রশান্তির কারণ হওয়া। কারণ সে সারাদিন পরিশ্রম করে দিন শেষে তার প্রিয়তমা অর্ধাঙ্গিনীর মুখে এক টুকরো হাসি ফোটানোর জন্য।

স্বামীর উপরে কখনোই কতৃত্ব খাটানো উচিত নয়। বরং ছায়া হয়ে সঙ্গে থাকা উচিত। যাতে করে শরীর ভুল কাজ করতে গেলেও ছায়া তাকে বাধা দেয়। প্রত্যেকটি স্ত্রীর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, তার স্বামীকে যথাযথ সম্মান দেয়া। আপনি যখন তাকে সম্মান দিবেন তখন এর বদলে সে আপনাকে ভালোবাসা দেবে।

আর একজন স্বামীর জন্য উচিত  হল তার স্ত্রীর সাথে মাধুর্যপূর্ণ আচরণ করা। কারণ স্ত্রীও সারাদিনরাত সংসারের সকল বিষয়ে তদারকি করেন। দেখুন আপনার ঘরের বেগমকে আপনি যখন বাজারের ব্যাগ এনে হাতে দেন, তারপর সে আপনাকে থালা ভর্তি বাহারি স্বাদের খাবার পরিবেশন করেন। যখন আপনি তাকে একটি ঘর তৈরি করে দেন সে আপনাকে গোটা একটা পরিবার তৈরি করে দেয়।

পরিবারে কে কি পছন্দ করে বা অপছন্দ করে সেটা আপনি জানেন না ঠিকই, কিন্তু সে সেগুলোরও খেয়াল রাখে। একজন পুরুষ সমানভাবে ঘরে-বাইরে দুদিকের ভারসাম্য ঠিক রাখতে পারে না। কিন্তু একজন মহিলা সে ঘরে-বাইরে দুদিকেই ঠিক মতো সামলে চলতে পারে। এত কিছুর পর অবশ্যই সে আপনার থেকে ভালো কোনো কিছুর আশা করতে পারেন।

সহীহ মুসলিম শরীফে, হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু তা’আলা আনহুর এক বর্ণনায় আছে যে, রাসুল সাল্লালাহ সালাম বলেছেন, আল্লাহ তায়ালা মহিলাদেরকে পাঁজরের বাঁকা হাড় থেকে সৃষ্টি করেছেন। যদি তুমি এটাকে সোজা করতে চাও, তবে তুমি সেটা ভেঙে ফেলবে। আর যদি তুমি তার থেকে উপকৃত হতে চাও, তবে বাঁকা অবস্থাতেই তোমার উপকৃত হতে হবে।

সংসার তখনই সুখের হয় যখন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক ভালো হয়। কারণ মনে রাখতে হবে স্বামী- স্ত্রী একে অন্যের বিপরীত কেউ নয়। দুজনেই এক ও অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্ত্রী হেরে গেল এর মানে হলো স্বামীও হেরে গেল। আবার স্বামী হেরে গেল এর মানে হলো স্ত্রীও হেরে গেল। 

সংসারের সকল বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে স্বামী-স্ত্রীর উভয়েরই মতামতের মিল থাকা জরুরি। যদি কখনো মতের অমিল হয়েও যায়, তখন আপসে সেটার সমাধান নিজেদেরই করে নেওয়া উচিত। কারণ সংসারে দুজনেই গুরুত্বপূর্ণ। নিজেদের মধ্যে ঝামেলা হলে নিজেরাই সমঝোতা করে মিটিয়ে নেওয়া উচিত এবং খেয়াল রাখা উচিত যাতে এই ঝামেলার সুযোগ তৃতীয় কেউ নিতে না পারে।

প্রবাদ আছে, অর্থই যত অনর্থের মূল।

এই ব্যাপারে সতর্ক হওয়া উচিত যে, নিজেদের সুন্দর সম্পর্কের মাঝে যেন কখনোই অর্থ নামক দেয়ালটি বাধা হয়ে না দাঁড়ায়। সংসারে একসময় স্বচ্ছলতা থাকবে অন্য সময় অসচ্ছলতা থাকবে এটাই স্বাভাবিক একটা প্রক্রিয়া। তবে স্বামী স্ত্রী যদি একে অপরের পাশে থাকে তবে সকল প্রতিকূলতা তাদের ভালোবাসার বন্ধনের কাছে মাথা নোয়াতে বাধ্য হবে।

নিজেদের মধ্যে ঝামেলা হলে তা কখনোই বাচ্চাদের সামনে প্রকাশ করা উচিত নয়। এর কারণে শিশু মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে এবং তার উপর এটা বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। যা একজন শিশুর মানসিক বিকাশের জন্য বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

নিজের পছন্দ- অপছন্দ একে অপরের ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। কারণ প্রত্যেকের নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ আছে। দেখুন এই ব্যাপারটা খুবই স্বাভাবিক যে, স্বামীর যা পছন্দ স্ত্রীর তা পছন্দ নয়। অথবা স্ত্রীর যা পছন্দ স্বামীর তা পছন্দ নয়। এর থেকে পরবর্তীতে মনোমালিন্যের সৃষ্টি হয়। একসময় যা ভয়ঙ্কর রূপও নিতে পারে।

তবে সবচেয়ে ভালো হয় যদি এই খুঁটিনাটি ব্যাপারগুলো নিজেরাই নিজেদের মধ্যে মানিয়ে গুছিয়ে  নেওয়ার অভ্যাস তৈরি করেন। যখন নিজেরা একজন অন্যজনকে প্রাধান্য দিবেন, তখন একজনের পছন্দ অন্যজনের পছন্দে আর একজনের অপছন্দ অন্যজনের অপছন্দে রূপান্তরিত হয়ে যাবে। আর অবশ্যই নিজেদের অভ্যাস ও পছন্দের ব্যাপারে আল্লাহ তা’লাকে ভয় করা জরুরি। কারণ আল্লাহ সুবহানাতায়ালা প্রত্যেককেই তার কাজের সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করবেন।

কখনোই দুজনের মধ্যে প্রতিদন্ধিতা সৃষ্টি হওয়া উচিত নয়। হতে পারে কেউ কারো থেকে কোন বিষয়ে কম বা বেশি। সেটা নিয়ে একে অন্যের সাথে অহংকারপূর্ণ আচরণ করা মোটেই সমীচীন নয়। কারণ আল্লাহ সবাইকে সবকিছুর ক্ষমতা দেন না। আর আল্লাহ প্রদত্ত ক্ষমতা নিয়ে অহংকার নয় বরং আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করা উচিত।

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।