অপচয় এক মহামারী

আমাদের মধ্যে সবসময় উচ্চারিত একটি সহজ শব্দ হলো ‘নেই’৷ অথচ এই নেই শব্দ আমরা ব্যবহার করি আমাদের নিজেদের অপচয়ের কারনেই৷

আমরা বেখেয়ালি ভাবে এত বেশি অপচয় করি যে, এই অপচয়ের কারণে কেউ না কেউ কোন না কোন ভাবে চরম মাত্রায় কষ্টের শিকার হচ্ছে৷

ইউনিসেফ ফুড ওয়েস্ট ইনডেক্স রিপোর্ট ২০২১ এর তথ্যমতে শুধুমাত্র বাংলাদেশেই একজন মানুষ বছরে গড়ে ৬৫ কেজি খাবার অপচয় করে৷

বাংলাদেশের জাতীয় গণমাধ্যম যুগান্তরের একটি প্রতিবেদন অনুসারে বাংলাদেশে প্রতি বছর ১ কোটি টনেরও বেশি খাবার অপচয় হয়৷ অথচ এখন পর্যন্ত দেশে প্রতি চারজন মানুষের একজন ক্ষুধার্ত থাকে।

সেই হিসাবে বর্তমানে দেশে ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪ কোটির ওপরে৷

বিশ্ব ক্ষুধা সূচক ২০২১ এ ১১৬ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান  ৭৬ তম৷ ভাবনার বিষয় হলো, যে দেশের মানুষ প্রতিবছর এক কোটি টন খাবার অপচয় করে সে দেশেই আবার প্রায় চার কোটি মানুষের কাছে খাবার নেই৷

‘নেই’ শব্দের চলার পথ আমরা তো এভাবেই তৈরি করি৷

খাদ্য আর বস্ত্র পরস্পরকে বন্ধু তো বলাই যায়, খাদ্যের ব্যাপারে ‘নেই’ আসলো তবে বস্ত্রের কথা বাদ যাবে কেন!

পোশাক মানুষের খুবই প্রয়োজনীয় বস্তু, আর তার সাথে সাথে সৌখিনতাও বটে৷ তবে বর্তমান সময়ে এসে আমরা একটু বেশিই ফ্যাশনের দিকে ঝুঁকছি৷

যেমন আমরা মোটা অংকের টাকা খরচ করে ঈদ, বিয়ে, জন্মদিন, পার্টি বা কোনো অনুষ্ঠানকে উপলক্ষ করে নতুন নতুন পোশাক কিনে থাকি৷ যা একবার ব্যবহারের পর আর দ্বিতীয়বার ব্যবহার করতে ইচ্ছে করে না৷

আর কয়েক মাস বা কয়েক বছর পর ওই পোশাকটির স্থান হয় ডাস্টবিনে৷

তাছাড়াও আমাদের বিনোদন জগতের তারকারা এক পোশাক দুবার পরে ক্যামেরার সামনে আসলেই খবরের শিরোনাম হয়ে যান৷ তাই তারাও একটা পোশাক একবার ব্যবহারের পরেই সেটা ফেলে রাখেন৷

এভাবেই দিনের পর দিন অব্যবহৃত পোশাক দিয়ে পোশাকের ভাগাড় তৈরি হচ্ছে৷

আমরা সুখ করছি, অনেক মানুষ অভুক্ত আর বস্ত্রহীন থাকছে আর ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রি হচ্ছে মিলিয়নিয়ার বা বিলিয়নিয়ার আর আমাদের পৃথিবী পরিণত হচ্ছে ফ্যাশন বর্জ্যের ভাগাড়ে৷

দিন দিন আমরা আধুনিক হচ্ছি, আমাদের ক্রয়ের হার বাড়ছে, জিনিসপত্রের ব্যয়ভার বেড়ে সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা কমছে৷

তাই আজও কারো কারো হাতে অর্থ নেই, গায়ে জড়ানোর মতো কাপড় নেই, মাথা গোঁজার মতো ঠাঁই নেই, মুখে দেওয়ার মতো খাবারও নেই৷ একটু ভাবলেই বুঝতে পারবো যে, তাদের এই ‘নেই’ এর কারণ হিসেবে কোথাও না কোথাও গিয়ে আমরাই দায়ী৷

বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে পানির স্তর অনেক নিচে নেমে গেছে, যে কারনে কোন কোন জায়গার মানুষের কাছে চাষাবাদের পানি নেই এমনকি খাবার পানিও নেই৷

অথচ আমরা বেমালুম পানি অপচয় করছি৷ গোসলে পানির অপচয়, ধোয়া-মোছায় পানির অপচয়, অজু-ইস্তেঞ্জাসহ সব জায়গাতেই পানির অপচয়৷

নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর, সমুদ্র কিংবা জলাধার সব আমাদের ময়লার ভাগাড়ে পরিপূর্ণ৷ কল-কারখানার দূষিত বর্জ্য দিয়ে মেরে ফেলেছি অসংখ্য নদ-নদী৷

এক গবেষণা সূত্রে জানা যায় যে, বাসা-বাড়িতে থালা বাটি ধোয়া, রান্নাবান্না, গোসল করা, দাঁত মাজা, হাত-মুখ ধোয়া এবং অন্যান্য কাজে একজন মানুষ গড়ে ৫০ লিটারেরও বেশি পানি খরচ করে৷

তাছাড়া যত দিন যাচ্ছে আমরা আধুনিক হচ্ছি আমাদের প্রয়োজন বাড়ছে৷ আমাদের সৌখিন চাহিদা মেটাতে বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রিজ বিভিন্ন সৌখিন পণ্য তৈরি করছে সেগুলোতেও অঢেল পানি খরচ হচ্ছে৷

রোর মিডিয়ার তথ্যমতে শুধুমাত্র আমাদের ব্যবহৃত পোশাকের মধ্যেই একটি  টি-শার্ট তৈরিতে প্রায় ২৭০০  লিটারের মত পানি খরচ হয়৷ এছাড়া আরো বিভিন্ন ক্ষেত্রে  পানির ব্যবহার তো আছেই৷

মোদ্দা কথা হল আমাদের অপচয়ই আমাদের ‘নেই’ বলার কারণ যদি আমরা আমাদের অপচয় কে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি আশা করা যায় হয়তো বা আমাদের ‘নেই’ শব্দের ব্যবহার একটু হলেও কমে আসবে৷

সারকথা হলো আমরা যদি আমাদের নিজেদের ওপর  নিজেরা নিয়ন্ত্রণ আনতে না পারি তাহলে সেদিন আর বেশি দূরে নয় যেদিন আমাদেরকে এই বিলাসী জীবনযাপনের খেসারত দিতে হবে৷

Leave a Comment

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।